কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বিজয়-২৪ হলে এক শিক্ষার্থীকে রাতভর র্যাগিং ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার পর ক্ষোভ ও রাগের বশে এক সিনিয়র শিক্ষার্থীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে ওই জুনিয়রের বিরুদ্ধে। তবে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর দাবি, কাউকে বাস্তবে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নয়, দীর্ঘ সময়ের মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ক্ষোভের বশে তিনি ওই কথাগুলো বলেছিলেন।
ভুক্তভোগী আমির হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তার অভিযোগ, গত ১৬ আগস্ট রাতে বিজয়-২৪ হলের ৩১২ নম্বর কক্ষে তাকে র্যাগিং করা হয়। এ ঘটনায় একই বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের মো. হাসান, অন্তু দাস ও মো. সরওয়ার সার্থক রিয়াদের বিরুদ্ধে গত ২৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি।
অভিযোগপত্র ও আমিরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১৬ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার বন্ধু অপূর্বকে ফোন করে হলে ডাকেন রিয়াদ। পরে আমির, অপূর্ব ও ইউসুফ ইকবাল ৩১২ নম্বর কক্ষে গেলে সেখানে রিয়াদ, অন্তু দাস ও হাসানসহ কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
আমিরের অভিযোগ, সেখানে তাকে আলাদা করে দাঁড় করিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। হলে ওঠার পর সিনিয়রদের সঙ্গে দেখা না করা, ফোন না দেওয়া এবং বাসে দেখা হওয়ার পর সালাম না দেওয়ার বিষয় নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়। পরে তাকে বিভিন্ন ধরনের ‘ফরমাল’ দিতে বাধ্য করা হয়।
ভুক্তভোগীর ভাষ্য, রাত ১২টার পর তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং কয়েকবার মারতে তেড়ে আসা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে ধমক ও গালাগাল করে তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগে আমির উল্লেখ করেন, তাকে ‘মাদারচুদ’, ‘বাইনচুদ’, ‘বোকাচোদা’সহ বিভিন্ন অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। লুঙ্গি পরা নিয়েও তাকে অপমান করা হয় এবং ‘লুঙ্গি খুলে ল্যাংটা করে পুরো হল ঘুরাব’ বলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ছাড়া তাকে ‘র্যাগিংয়ের পাঁচটি উপকারিতা’ বলতে বলা হয় এবং দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। তার ভিডিও ধারণ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন আমির। একপর্যায়ে আর সহ্য করতে না পেরে রাত প্রায় ৩টার দিকে তিনি হল থেকে দৌড়ে বের হয়ে মেসে চলে যান।
আমির বলেন, “আমি বারবার বলছিলাম, ভাই আমাকে ছেড়ে দেন। আমি ভুল করেছি, আর কখনো এমন হবে না। কিন্তু তারা আমার কথা শুনছিল না। পরে আর সহ্য করতে না পেরে দৌড়ে হল থেকে বের হয়ে মেসে চলে আসি।”
তার দাবি, ঘটনার পর থেকে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ঘুম ও খাওয়া-দাওয়ায় সমস্যা দেখা দেয় এবং হলে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। তার বেডসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র এখনো হলে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ক্ষোভে সিনিয়রকে হুমকি
র্যাগিংয়ের ঘটনার পর অন্তু দাসকে ফোন করে নিজের পরিচয় গোপন রেখে হুমকিসূচক বক্তব্য দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন আমির। তার ভাষ্য, দীর্ঘ সময়ের মানসিক নির্যাতন ও পরিবারকে নিয়ে অশালীন মন্তব্যের কারণে ক্ষোভ ও রাগের বশে তিনি ওই কথা বলেন।
অভিযোগপত্রে আমির উল্লেখ করেন, ফোনে তিনি বলেন, ‘আমার চৌদ্দগোষ্ঠী রাজনীতি করে। ক্যাম্পাস থেকে উঠায় নিয়ে লাশ গুম করে দেব।’
তবে এ বক্তব্য দেওয়ার উদ্দেশ্য হুমকি দেওয়া ছিল না দাবি করে আমির বলেন, “ওই সময় আমার মাথা ঠিক ছিল না। আমাকে অনেকক্ষণ ধরে গালিগালাজ করা হয়েছে। আমার মা-বাবাকে নিয়েও কথা বলা হয়েছে। আমি প্রচণ্ড রাগ ও ক্ষোভের মধ্যে কথাগুলো বলে ফেলেছি। কাউকে বাস্তবে ক্ষতি করার উদ্দেশ্য আমার ছিল না।”
এ ঘটনায় অন্তু দাস থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির এসআই জিয়াউর রহমান বলেন, “অন্তু দাস নামে একজন শিক্ষার্থী অনলাইনে একটি জিডি করেছেন। তার অভিযোগ ছিল, তাকে ফোন করে মেরে ফেলা ও লাশ গুম করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। যে শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, তার নাম আমির। তারা সবাই অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী।”
তিনি বলেন, “তদন্তের স্বার্থে আমিরের সঙ্গে কথা বললে সে জানায়, অন্তু দাসসহ তিনজন মিলে তাকে র্যাগ দিয়েছে। বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।”
বিভাগ ও প্রশাসনের বক্তব্য
আমির জানান, ঘটনার দিনই তিনি অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানকে বিষয়টি জানান। পরে র্যাগিংয়ের অভিযোগসংক্রান্ত কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ ও অডিও রেকর্ডিং বিভাগীয় প্রধানকে দেখানো ও শোনানো হয়।
অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. শামীমুল ইসলাম বলেন, “আমি বিষয়টি সম্পর্কে জেনেছি। হলের কোনো একটি বিষয় নিয়ে সিনিয়ররা জুনিয়রদের ডেকে কথাবার্তা বলেছে। একটু দীর্ঘ সময় ধরেই কথা বলেছিল। ছেলেটি কিছুটা মানসিকভাবে কষ্ট পেয়ে হল ছেড়ে দিয়েছিল। পরবর্তীতে আমি সবাইকে ডেকে কথা বলেছি। আমার সামনে দুপক্ষই বিষয়টি সমাধান হয়েছে বলে জানিয়েছে।”
তবে আমিরের দাবি, বিভাগীয় পর্যায়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা হলেও তিনি নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। পরে গত ২৩ আগস্ট প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম বলেন, “এ বিষয়ে আমরা প্রক্টরিয়াল বডির মিটিং করেছি। ঘটনা যেহেতু অর্থনীতি বিভাগের, সেজন্য বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে আগে কথা বলে তারপর জানাতে পারব।”
অভিযোগ অস্বীকার করে অন্তু দাস বলেন, “এগুলো ভিত্তিহীন। এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। এ বিষয়ে আমার সঙ্গে বিভাগের কোনো যোগাযোগ হয়নি।”
তবে জুনিয়র কেন হুমকি দিয়েছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, " উদ্দেশ্যপ্রণিতভাবেই আমাকে এবং আমার সহপাঠীকে হুমকি দিয়েছে, র্যাগিং এর কোন ঘটনা ঘটেনি, হুমকি পেয়ে ভয়ে আমি থানায় গিয়ে মামলা করি "
তবে আমির হোসেন এ ব্যাপারে বলেন যে আমাকে র্যাগ দেওয়ার কারণেই আমি ক্ষোভে উনাদের অপরিচিত নাম্বার থেকে হুমকি দিয়েছি।
অভিযুক্ত মো. হাসান বলেন, “কোনো র্যাগিং দেওয়া হয়নি। সে যে অভিযোগগুলো করছে, সেগুলো মিথ্যা। তার মানসিকভাবে অসুস্থতার বিষয় রয়েছে। আর যে গালাগালির কথা বলা হচ্ছে, সেটি অন্য একটি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে।”
অভিযুক্ত রিয়াদকে ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর কল রিসিভ করেননি।
বিজয়-২৪ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান খান বলেন, “আমাকে বিষয়টি সম্পর্কে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। আমি চাই, কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গেই যেন জুলুম করা না হয়। এ বিষয়ে যদি কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, তাহলে তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।”
১৩ ঘন্টা আগে বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২৭, ২০২৬